শ্রী গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম: জীবনের সব বিঘ্ন দূর করার ১০৮ পবিত্র নাম,ও পাঠের নিয়ম

Share Please:
গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম

গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম: হল ভগবান শ্রীগণেশের ১০৮টি নামের একটি পবিত্র সংকলন। ভগবান শ্রীগণেশকে হিন্দু ধর্মে জ্ঞান, বুদ্ধি ও সিদ্ধির দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। যেকোনো শুভ কাজ, পূজা বা যজ্ঞ শুরু হয় তাঁর নাম উচ্চারণের মাধ্যমে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, গণেশের ১০৮টি নাম বা অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করলে জীবনের সমস্ত বিঘ্ন দূর হয় এবং জীবনে সফলতা, জ্ঞান, সৌভাগ্য ও আনন্দ আসে। এই নামগুলি ভগবান গণেশের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও গুণকে প্রকাশ করে। তাই প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও শ্রদ্ধাভরে এই নামগুলো জপ করলে মন শান্ত হয়, পরিবারে আসে সুখ-শান্তি আর জীবনের পথে আসে সফলতা।

শ্রী গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম পাঠের নিয়ম

  1. ভোরবেলা স্নান করে পরিষ্কার কাপড় পরে বসুন।
  2. একটি পরিষ্কার আসনে লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে তার উপর শ্রীগণেশের প্রতিমা বা ছবি স্থাপন করুন।
  3. ধূপ, দীপ, ফুল, দূর্বা ও লাড্ডু নিবেদন করুন।
  4. প্রথমে ‘ওঁ গণেশায় নমঃ’ মন্ত্র জপ করে পরে ধীরে ধীরে ১০৮ নাম পাঠ করুন।
  5. শেষে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন – জীবনের সব বাধা দূর করে জ্ঞান, বুদ্ধি ও সমৃদ্ধি দান করুন।

শ্রী গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম (১০৮ নাম)

ভগবান গণেশের ১০৮টি নাম একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অষ্টোত্তর শতনাম। প্রতিটি নাম তাঁর বিশেষ গুণ, রূপ এবং শক্তির প্রতীক। এগুলি পাঠ করলে জীবনের সমস্ত বাধা দূর হয় এবং সফলতার পথ উন্মুক্ত হয়।

শ্রীশ্রী গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম

গণেশের প্রথম নামসমূহ

প্রথমে গণেশ নাম রাখিল পাবক, পরে নাম গণাধিপ রাখিল ত্র্যম্বক॥
যত সিদ্ধগণ মোর নাম রাখে গণ, নাম রাখে গণাগ্রহী নমুচিসূদন॥
নাম রাখে গণাধ্যক্ষ যত তুরাসাহ, গণেশ্বর নাম দিল শ্রীগন্ধবাহ॥
নাম দিল গণনাথ ভ্রাতা কার্ত্তিকেয়, নাম রাখে গণদেবেশ্বর রৌহিনেয়॥

দেবগণ প্রদত্ত নাম

গণচলবাসী নাম দিল শ্রীভাস্কর, গণনায়ক নামে ডাকে দেব ক্ষপাকর॥
নাম দিয়েছেন গণরাজ বিরূপাক্ষ, নাম রাখিলেন গণকর্ত্তা সহস্রাক্ষ॥
গণপতি নামে ডাকে তাঁর পিতা হর, নাম রাখে গজানন দেব দামোদর॥
নাম দিল গৌরীসুত মহাদেবী তারা, গজকর্ণ নাম দিলেন মুনি শ্রীঅঙ্গিরা॥

ঋষি ও দেবতার দেওয়া নাম

দানিলেন গজবক্ত নাম সেই মনু, বিনায়কেশ-পুত্র নাম রাখিলেন ভানু॥
গুহাগ্রজ নাম রাখিলেন সুরপতি, নাম দিল সুরাগ্রজ দেব বৃহস্পতি॥
নাম রাখে উমাপুত্র যে মেনকারাণী, বিঘ্ন বিনাশন নাম দিল অব্জযোনি॥
বিঘ্নরাজ নাম দিল বৃহতিসূদন, নাম দেন বিঘ্নকর্ত্তা রুক্মিণী-রমণ॥

বিঘ্নহর্ত্তা রূপে নামসমূহ

নাম দিল বিঘ্নহারী দেব ত্রিপুরারি, বিঘ্ন বিনায়ক নাম দিল শম্বরারি॥
বিঘ্নসিদ্ধি নাম দিয়েছেন কংসাবতি, বিঘ্নেশ নাম দিয়েছেন প্রজাপতি॥
নাম দেন বিঘ্ন-বিনাশক খগেশ্বর, বিঘ্নহর্ত্তা নাম দিয়েছেন নাগেশ্বর॥
পার্ব্বতীপ্রিয় নাম দেন মাতামহী, নাম রাখিলেন হরসূনু মহামতী॥

হেরম্ব ও মহাকায় রূপ

এক নাম হেরম্ব দিলেন ইন্দিরা, নাম দিয়েছেন স্থূলকর্ণ চারুধারা॥
দেবেরদেবেশ নাম দিয়েছিল বিষ্ণু,স্কন্দাগ্রজ নাম রাখিলেন শ্রীবিষ্ণু॥
নাম দেন মহাকায় ঋষি কাত্যায়ন, প্রিয়ঙ্কর নাম রাখিলেন নারায়ণ॥
কাম অরিসূনু নাম রাখেন হারিত, রুদ্রপ্রিয় নাম তাই দিলেন লিখিত॥

লেখক ও জ্ঞানদাতা রূপে

সুমুখ তার নাম রাখিল সম্বর্ত্ত, সর্ব্বেশ্বর নাম রাখেন সকল অমর্ত্ত॥
সুলেখক নাম দিল বেদব্যাস, ভারত-লেখক নাম দিয়েছে কৈলাস॥
ভালচন্দ্র নাম ভাল দিয়েছে উষণা, অভীষ্টদায়ক নাম দেন দেবসেনা॥
নাম দিল চন্দ্রমৌলি নিজেই দম্ভোলি, মূষিকবাহন নাম দিয়েছে মাতালি॥

সিদ্ধি প্রদানকারী নাম

বজ্রতুন্ড নাম দিয়েছেন বজ্রানি, সদাদান নাম দিয়েছেন বীণাপাণি॥
পাশহস্ত নাম দিল ইন্দ্রায়ূধ শম্ব, শুভদাতা নাম দিয়েছেন আপস্তম্ব॥
অত্রি দিয়েছেন ত্রিলোচন ভাল নাম, মাতা জগদ্বাত্রী দিল চতুর্ভূজ নাম॥
একদন্ত রাখে নাম শ্রেষ্ঠ ঐরাবত, বিকট আর নাম রাখেন মরুত॥

সিদ্ধিদাতা রূপে নামসমূহ

রাখিলেন সিদ্ধি নাম মহর্ষি গৌতম, সিদ্ধিসেনাগ্রজ নাম রাখেন শ্রীযম॥
সিদ্ধিদাতা নাম ভাল রাখেন বিষ্ণুরথ, সিদ্ধি বিনায়ক নাম রাখে শাতাতপ॥
নাম রাখে সিদ্ধযোগী ঋষি বাচস্পতি, সিদ্ধসাধক নাম রাখে পশুপতি॥
সিদ্ধিরূপ নামেতে ডাকে সুরজ্যেষ্ঠ, নাম রাখে সিদ্ধদেব সূনু গ্রহশ্রেষ্ঠ॥

যজ্ঞ ও যোগসিদ্ধি রূপে

যজ্ঞসিদ্ধি নাম রাখিলেন ক্রুতু, মন্ত্রসিদ্ধি নাম রাখিলেন শতক্রতু॥
যোগসিদ্ধি নাম ডাকে সাংখ্য কপিল, জপসিদ্ধি নাম রাখিল অনিল॥
দানসিদ্ধি নাম রাখে দৈত্যরাজ বলি, কর্ম্মসিদ্ধি নাম রাখিলেন মহাশূলী॥
নাম রাখে কামসিদ্ধি দত্তাত্রেয় ঋষি, তপঃসিদ্ধি নাম রাখে শান্ডিল্য মহর্ষি॥

জ্ঞান ও ব্রহ্মস্বরূপ

সর্ব্বসিদ্ধিদাতা নাম রাখেন দেবর্ষি, দানিল সর্ব্বজ্ঞ নাম জনক রাজর্ষি॥
স্বস্তিদঃ নাম রাখিলেন শ্রীদক্ষ, তাঁর নাম দানিলেন ঋদ্ধিদঃ ঋভুক্ষ॥
ঋতজ্ঞান নাম দানিলেন বিরিঞ্চি, ঋতধাম নাম দিয়েছেন শ্রীমরীচি॥
ঋতম্ভরা নাম দিয়েছেন পাতঞ্জল, লেন ঋতম নাম সপ্তর্ষি মন্ডল॥

ব্রহ্ম ও অদ্বৈত স্বরূপে

সত্যম্ আর নাম রাখেন পুলহ, গুণাতীতম নাম দেন পিতামহ॥
নাম দিয়েছেন পুরুষম শ্রীপুলস্ত্য, কৃষ্ণপিঙ্গলাম নাম দিলেন অগস্থ্য॥
শুদ্ধাত্মা নাম তবে দিলেন কর্দ্দম, মহামৃত্যুসুত নাম দানিলেন যম॥
ভক্তবত্সল নাম রাখেন ইন্দ্রানী, সর্ব্বভীষ্টপ্রদ নাম রাখিল রোহিণী॥

ভক্তপ্রিয় ও দয়াময় রূপে

শৈলাসুতাসুত নাম রাখে হিমালয়, ভক্তের পরমাগতি বলেন মৃত্যুঞ্জয়॥
দ্বিরদানন নাম দিয়েছেন খগেশ্বর, সর্ব্বশুভঙ্কর নাম রাখিল শঙ্কর॥
বিনায়ক নাম ভাল দেন বিনায়িকা, দ্বৈমাতুর নাম দিলেন চন্ডিকা॥
বরেণ্য নাম দিল স্বয়ং ভার্গব, ভর্গ নাম দিয়েছেন ভক্ত ধ্রুব॥

পরম ব্রহ্মস্বরূপ

অক্ষর নাম ভাল দিলেন অর্য্যমা, নিত্যমুক্ত স্বভাব নাম দিয়েছেন রমা॥
নাম দিয়েছেন ব্রহ্মবর্চ্চস বশিষ্ঠ, ব্রহ্মভূয় নাম রাখিলেন সুরজ্যেষ্ঠ॥
ব্রহ্মযোগ নাম রাখিলেন বিশ্বামিত্র, সুব্রহ্মণ্যাগ্রজ নামে ডাকেন শ্রীমিত্র॥
প্রণবস্বরূপ নামে হন সনাতন, অদ্বৈত্বস্বরূপ হন জগত্কারণ॥
অস্তর্য্যামিস্বরূপ আর নাম ব্রহ্মরূপ, জ্যোতির্জ্জ্যোতিস্বয়ংজ্যোতি পূর্ণব্রহ্মস্বরূপ॥


গণেশ অষ্টোত্তর শতনামের মাহাত্ম্য

  • এই ১০৮ নাম প্রতিটি ভগবান গণেশের ভিন্ন ভিন্ন গুণ, রূপ ও শক্তিকে প্রকাশ করে।
  • নাম জপ করার মাধ্যমে মানসিক স্থিরতা, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি বজায় থাকে এবং ভক্ত জীবনে বাধাহীন অগ্রগতি লাভ করে।
  • পূজা, ব্রত বা যেকোনো শুভকার্যে এই নামসমূহ পাঠ করলে দেবতা দ্রুত তুষ্ট হন।

উপকারিতা

  • জীবনে বাধাহীন অগ্রগতি হয়।
  • পরীক্ষায় সাফল্য ও বুদ্ধিবৃত্তি বৃদ্ধি পায়।
  • ব্যবসা, চাকরি বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে উন্নতি আসে।
  • ভক্তের মন শান্ত থাকে ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়।

উপসংহার

গণেশ অষ্টোত্তর শতনাম কেবল নামের তালিকা নয়, এটি ভক্তির এক বিশেষ রূপ। ভগবান গণেশের এই ১০৮ নাম যদি ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়, তবে জীবনের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে। তাই প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও এই নামসমূহ পাঠ বা শোনা উচিত।


আরও ধর্মীয় ভক্তিমূলক আর্টিকেল পড়ুন।


Share Please:
অস্বীকৃতি

এই লেখা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তথ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এতে বর্ণিত পুজা পদ্ধতি, মন্ত্র এবং অন্যান্য তথ্য প্রাচীন শাস্ত্র, লোকাচার ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। পাঠকদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজের বিশ্বাস ও সুবিধা অনুযায়ী পুজা পদ্ধতি গ্রহণ করুন। যেকোনো ধর্মীয় কাজ করার আগে যোগ্য পণ্ডিত বা বিদ্বান থেকে পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই লেখায় দেওয়া তথ্য ব্যবহারের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারকারীর ওপর থাকবে।

নমস্কার! আমি শ্রী গোপাল চন্দ্র — একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু সনাতনী। আমি বিগত সাত বছরের ও অধিক সময় ধরে, হিন্দু ধর্ম, সনাতন সংস্কৃতি এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য নিয়ে নিয়মিতভাবে অনুশীলন ও লেখালেখি করে আসছি। আমি হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্মগ্রন্থ, এবং আধ্যাত্মিকতার জ্ঞান সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলেই এই মহান ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি যে সনাতন ধর্ম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি একটি জীবনধারা, যা আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ বোঝায়।"

Leave a Comment